অ্যাওর্টিক স্বাস্থ্য নিয়ে বিশেষ মনোযোগের আহ্বান চিকিৎসক মহলের

কলকাতা, ২১ জানুয়ারি ২০২৬ – বিশ্বজুড়ে অ্যাওর্টাকে (Aorta) একটি স্বতন্ত্র ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হিসেবে ক্রমবর্ধমান স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে নারায়ণা আরএন টেগোর হাসপাতাল, মুকুন্দপুরে জটিল ও অতি-জটিল অ্যাওর্টিক রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে, যা অ্যাওর্টিক রোগের সময়মতো সনাক্তকরণ ও চিকিৎসা নিয়ে জনসচেতনতা এবং চিকিৎসাগত গুরুত্ব বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তাকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরছে।

অ্যাওর্টা মানবদেহের বৃহত্তম ধমনী, যা শরীরের সব গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে অক্সিজেনযুক্ত রক্ত সরবরাহ করে। সাম্প্রতিক চিকিৎসা অগ্রগতির ফলে অ্যাওর্টাকে একটি পৃথক অঙ্গতন্ত্র হিসেবে পুনঃশ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে, কারণ এর রোগসমূহ অত্যন্ত জটিল এবং চিকিৎসার জন্য বিশেষায়িত সার্জিক্যাল দক্ষতার প্রয়োজন হয়। অ্যাওর্টিক অ্যানিউরিজম, ডিসেকশন এবং জটিল অ্যাওর্টিক আর্চ ও থোরাকো-অ্যাবডোমিনাল রোগের ক্ষেত্রে নির্ভুল রোগনির্ণয়, উন্নত ইমেজিং এবং সমন্বিত মাল্টিডিসিপ্লিনারি চিকিৎসা অত্যন্ত জরুরি। দুঃখজনকভাবে, এই রোগগুলির উপসর্গ প্রায়ই হার্ট অ্যাটাকের মতো হওয়ায় বহু ক্ষেত্রে দেরিতে রোগ ধরা পড়ে।


গত কয়েক বছরে নারায়ণা আরএন টেগোর হাসপাতাল পূর্ব ভারতের বিভিন্ন রাজ্য যেমন ওড়িশা (ভুবনেশ্বর), মিজোরাম, মণিপুর এবং দেশের অন্যান্য প্রান্ত থেকে আগত বহু রোগীর চিকিৎসা করেছে। এমনকি ভুটানের মতো প্রতিবেশী দেশ থেকেও রোগীরা এখানে চিকিৎসার জন্য আসছেন। চিকিৎসকদের মতে, প্রায় ৩০ শতাংশ অ্যাওর্টিক রোগ প্রথমে ভুলভাবে হৃদরোগ হিসেবে চিহ্নিত হয়, কারণ উভয় ক্ষেত্রেই হঠাৎ বুকে ব্যথা দেখা যায়। তবে হার্ট অ্যাটাকের তুলনায় তীব্র অ্যাওর্টিক সমস্যা অনেক দ্রুত মারাত্মক রূপ নিতে পারে এবং প্রথম ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই মৃত্যুঝুঁকি অত্যন্ত বেশি থাকে, ফলে সময় এখানে জীবন-মৃত্যুর পার্থক্য গড়ে দেয়।

নারায়ণা আরএন টেগোর হাসপাতালের সিনিয়র কনসালট্যান্ট – কার্ডিয়াক সার্জারি ও অ্যাওর্টিক সার্জারি প্রোগ্রামের প্রধান ডা. অতনু সাহা বলেন,

“অ্যাওর্টিক রোগ অনেক সময় নীরবে বা ভুলভাবে বোঝা হয়, যতক্ষণ না তা জরুরি অবস্থায় পরিণত হয়। হার্ট অ্যাটাকের সঙ্গে উপসর্গের মিল থাকায় রোগ নির্ণয়ে বিলম্ব হয়। বুকে ব্যথা নিয়ে আসা রোগীদের ক্ষেত্রে শুরুতেই সিটি স্ক্যান ও ইকোকার্ডিওগ্রাফি (ECHO) করলে অ্যাওর্টিক ও হৃদরোগের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করা সম্ভব হয় এবং সঠিক চিকিৎসা পরিকল্পনা করা যায়। এই ধরনের পরিস্থিতিতে নিজের উদ্যোগে ওষুধ খাওয়া বা চিকিৎসা নিতে দেরি করা একেবারেই উচিত নয়।”

তিনি আরও বলেন, “অ্যাওর্টিক রোগ সাধারণত বয়স্কদের সঙ্গে যুক্ত বলে মনে করা হলেও বর্তমানে ৩০–৪০ বছর বয়সী, বিশেষ করে লম্বা গড়নের মানুষের মধ্যেও এই রোগ বাড়ছে। জন্মগতভাবে ত্রুটিপূর্ণ অ্যাওর্টিক ভাল্‌ভ, অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ, ধূমপান এবং গর্ভাবস্থায় থাকা মহিলারা বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকেন। এছাড়া একটি ভুল ধারণা রয়েছে যে পেসমেকার থাকা রোগীরা অ্যাওর্টিক রোগে আক্রান্ত হন—এটি সম্পূর্ণ ভুল।”

ডা. শুভ্র এইচ. রায় চৌধুরী, ডিরেক্টর ও ক্লিনিক্যাল লিড, ইন্টারভেনশনাল ও এন্ডোভাসকুলার রেডিওলজি বলেন,
“জটিল অ্যাওর্টিক রোগের চিকিৎসার জন্য প্রকৃত অর্থে মাল্টিডিসিপ্লিনারি পদ্ধতির প্রয়োজন। আমাদের কেন্দ্রে কার্ডিয়াক সার্জন, ভাসকুলার বিশেষজ্ঞ, ইন্টারভেনশনাল টিম ও ইমেজিং বিশেষজ্ঞরা একসঙ্গে কাজ করেন, যাতে প্রতিটি রোগীর জন্য সবচেয়ে নিরাপদ ও কার্যকর চিকিৎসা পথ নির্ধারণ করা যায়। উন্নত সিটি ইমেজিং, ক্যাথেটারাইজেশন ল্যাব এবং ওপেন সার্জারির সুবিধার মাধ্যমে আমরা উচ্চ ঝুঁকির অ্যাওর্টিক রোগেও সঠিক রোগনির্ণয় ও সময়োপযোগী চিকিৎসা দিতে সক্ষম হই। আমাদের ভাসকুলার ল্যাবে সহজলভ্য আউটপেশেন্ট আল্ট্রাসাউন্ড পরিষেবা রয়েছে এবং অ্যাওর্টিক ও অন্যান্য ভাসকুলার রোগের প্রাথমিক স্ক্রিনিংও করা হয়।”

ডা. ললিত কাপুর, সিনিয়র কনসালট্যান্ট – কার্ডিয়াক সার্জারি বলেন,
“অ্যাওর্টিক সার্জারি কার্ডিয়াক সার্জারির মধ্যেও একটি সুপার-সুপার-স্পেশালিটি ক্ষেত্র, যেখানে অতিরিক্ত দক্ষতা অর্জন অত্যন্ত জরুরি। শুধু কার্ডিয়াক সার্জন নন, ভাসকুলার সার্জন ও ইন্টারভেনশনাল রেডিওলজিস্টদের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই রোগীর সর্বোত্তম চিকিৎসা নিশ্চিত করে। এই সংকটজনক সময়ে রোগীর পক্ষে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ঘোরা সম্ভব নয়। তাই এমন একটি ডেস্টিনেশন সেন্টার প্রয়োজন যেখানে সব ধরনের সুবিধা এক জায়গায় পাওয়া যায়—যা নারায়ণা আরএন টেগোর হাসপাতালে উপলব্ধ। অ্যাওর্টিক টিমকে অ্যানাটমি, ফিজিওলজি, সঠিক সময়ে হস্তক্ষেপ এবং সর্বোপরি টিমওয়ার্ক সম্পর্কে সম্পূর্ণ সচেতন থাকতে হয়।”

নারায়ণা আরএন টেগোর হাসপাতাল এই অঞ্চলে প্রথম নিয়মিতভাবে উন্নত অ্যাওর্টিক সার্জারি যেমন ফ্রোজেন এলিফ্যান্ট ট্রাঙ্ক, জটিল ফেনেস্ট্রেশন ও চিমনি পদ্ধতি চালু করে। বর্তমানে পূর্ব ভারতের অন্যতম সর্বাধিক জটিল অ্যাওর্টিক কেস এখানেই চিকিৎসা করা হয়। বহু ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ অ্যাওর্টা জড়িত থাকে বা জরুরি অবস্থায় রোগী আসেন, যার জন্য বিশেষ পরিকাঠামো, দ্রুত রোগনির্ণয় এবং অভিজ্ঞ মাল্টিডিসিপ্লিনারি টিম অপরিহার্য। প্রতিবছর এই ধরনের রোগীর সংখ্যা বাড়ছে, যা অ্যাওর্টিক রোগের ক্রমবর্ধমান বোঝা এবং প্রাথমিক পর্যায়ে সনাক্তকরণের গুরুত্বকে তুলে ধরে।

মি. অভিজিৎ সি.পি., ডিরেক্টর ও ক্লাস্টার হেড – কলকাতা ও কর্পোরেট গ্রোথ ইনিশিয়েটিভ, নারায়ণা হেলথ (ইস্ট) বলেন,
“অ্যাওর্টিক রোগের অগ্রসর অবস্থায় রোগীর সংখ্যা বাড়া আমাদের আরও বেশি সচেতনতা, সময়মতো রোগনির্ণয় এবং সঠিক রেফারালের প্রয়োজনীয়তার কথা মনে করিয়ে দেয়। অ্যাওর্টিক স্বাস্থ্যের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দিলে এই প্রাণঘাতী রোগগুলির ফলাফল অনেক উন্নত করা সম্ভব।”

এ বিষয়ে মি. আর. ভেঙ্কটেশ, গ্রুপ সিওও, নারায়ণা হেলথ বলেন,
“অ্যাওর্টিক রোগ অত্যন্ত মারাত্মক হলেও এখনও তা যথাযথভাবে চিহ্নিত হয় না। চিকিৎসক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে এই সচেতনতা জরুরি যে সব বুকের ব্যথা হৃদরোগজনিত নয়। প্রাথমিক ইমেজিং ও সঠিক রোগনির্ণয় রোগীর জীবন বাঁচাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।”

চিকিৎসকদের মতে, হঠাৎ বুকে বা পিঠে ব্যথা, পেটের ব্যথা, অকারণ শ্বাসকষ্ট এবং অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপের মতো লক্ষণগুলোকে কখনও অবহেলা করা উচিত নয়। উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের জন্য নিয়মিত স্ক্রিনিং এবং প্রাথমিক পর্যায়ে ইমেজিং-ভিত্তিক মূল্যায়ন করলে সময়মতো চিকিৎসার মাধ্যমে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ও দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত করা যায়।

Comments

Popular posts from this blog

A new flight for healthcare in Kolkata, Aastik Healthcare to offer e-clinics and online pharmacy alongside physical counterparts

পূর্ব রেলওয়ে / শিয়ালদহশিয়ালদহ বিভাগের টিকিট পরীক্ষকদের জন্য বিশেষ পরিচয় ব্যাজ চালু

জাপান ক্যারাটে ইন্ডিয়ার বার্ষিক গ্রেটেশন এক্সামিনেশন